রহস্যময় মিথেনের প্লুম বাংলাদেশে – ধান চাষকে দোষারোপ করার আগে ভেবে দেখুন

ঘটনার সূত্রপাত ৮ ই এপ্রিল, যখন ফ্রান্সের একটি বেসরকারি স্যাটেলাইট প্রযুক্তি কোম্পানি তাদের ওয়েবসাইটে একটি খবর প্রকাশ করে যেখান থেকে জানা যায় বাংলাদেশের ওপরে রহস্যময় মিথেনের প্লুম দেখা গেছে নভেম্বর থেকে মার্চ এর মধ্যে যা স্যাটেলাইটে ধরা পড়েছে। ঢাকা এবং সন্নিহিত বিস্মিত অঞ্চল জুড়ে মিথেন গ্যাসের মাত্রা অনেকটাই বেশি পাওয়া গেছে। যেহেতু মিথেন গ্রীন হাউস গ্যাস হিসেবে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের থেকে অনেকগুণ ক্ষতিকারক সেহেতু এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই জল্পনা শুরু হয়ে যায় এই মিথেনের উৎস কি? বিশ্বজুড়ে বিশেষজ্ঞরা মিথেনের উৎস নির্ধারণ করেছেন এবং দেখা গেছে জলাভূমি, ধানক্ষেত, আবর্জনা পূর্ণ ভ্যাট, পশুপালন, ন্যাচেরাল গ্যাসের পাইপ লাইন লিক হওয়া এবং কয়লার স্তূপ এইগুলি মূলত বিশ্বজুড়ে মিথেনের উৎস। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি সংবাদ মাধ্যমের খবর আমাদের কাছে এসে পৌঁছায় এবং সেখানে ধানক্ষেতকে এই মিথেনের উৎসরূপে চিহ্নিত করা হয়। প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো, মিথেনের প্রাকৃতিক এবং কৃত্তিম ভাবে উৎস আছে এবং প্রাকৃতিক ভাবে উৎপন্ন মিথেনের পরিমাণ ৪০%। বিশ্বজুড়ে মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে বাকি ৬০% মিথেনের উৎসের একের তিন অংশ আসে গ্যাস পাইপলাইন লীকের থেকে, প্রায় ১/৩ অংশ আসে পশুপালন থেকে। মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে উৎপন্ন মিথেন এর মাত্র ১৫ ভাগ আসে খাবার তৈরির ফলে এবং সেখানে ধান চাষ একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। প্রাকৃতিক ভাবে টারমাইট কলোনি বা উইপোকা মিথেনের পরিমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাতাসে মেশায়।

বাংলাদেশ মিথেনের এই আধিক্যের কারণ হিসেবে মূলত বলা হয়েছে ধান চাষ, ল্যান্ডফিল বা আবর্জনা থেকে বেরোনো মিথেন এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের লিক বা কয়লার স্তুপ থেকে বেরোনো মিথেন। যে সময়ে এই স্যাটেলাইটের তথ্য নেওয়া হয়েছে বিশেষত ফেব্রুয়ারি এবং মার্চ মাসে সেই সময় কিন্তু ধানক্ষেতে জল থাকে না। বাংলাদেশ থেকে কৃষি বিশেষজ্ঞ শিবব্রত ভৌমিক আমাদের জানালেন শীতের পর থেকেই সমস্ত জল শুকিয়ে যায় এবং এই সময়ে জলমগ্ন থাকার কোনো সুযোগই থাকেনা খেদ গুলিতে। আবার জুন জুলাই মাস থেকে জলমগ্ন অবস্থা শুরু হয়। কাজেই উপগ্রহ চিত্রে মিথেনের যে বাড়বাড়ন্ত দেখা গেছে তাতে ধান জমির অবদান থাকে না বলেই বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞদের ধারণা। এই মিথেন প্লুমের আশেপাশে বেশ কয়েকটি ল্যান্ডফিল সাইট বা বর্জ্য পদার্থের ভ্যাট লক্ষ্য করা গেছে এবং সেইগুলি হতেই পারে মিথেনের উৎস। বাংলাদেশি জলবায়ু বৈজ্ঞানিক ডঃ আসান উদ্দিন ডেইলি স্টারকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে এই মিথেন এর উৎস যে বাংলাদেশ তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে মিথেন বাতাসে এক দশকের কাছাকাছি থাকতে পারে ফলে এই মিথেন এর উৎস বাংলাদেশ নাও হতে পারে। হতেই পারে পার্শ্ববর্তী কোন অঞ্চল থেকে এই মিথেন বাতাসে ভেসে এসেছে এবং

আবহাওয়ার জন্য বিশেষ কোন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে যাতে এই মিথেন ওই অঞ্চলে সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে কিছুদিনের জন্য। স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী অবশ্যই বাংলাদেশের ওপরে মিথেনের মাত্রা অত্যধিক বেশি ছিল সেই নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু স্যাটেলাইট থেকে এই মিথেন এর উৎস সম্পর্কে কিন্তু সম্যক ধারণা করা মুশকিল। পরিশেষে এটি বলাই যায় যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যে দেশগুলি অত্যন্ত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার মুখে দাঁড়িয়ে তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। কাজেই উৎস যাই হোক না কেন বাংলাদেশের ওপরে মিথেনের অবস্থান কিন্তু আশঙ্কার জায়গা সৃষ্টি করছে। বিশ্বজুড়ে যখন মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে মিথেনের উৎসের অন্যতম প্রাকৃতিক গ্যাসের লাইন লিক এবং আবর্জনার স্তুপ, তখন আমাদের জীবন-জীবিকার সাথে জড়িত ক্ষেত্রগুলি অর্থাৎ ধান চাষ এবং পশুপালন কে বাঁচিয়ে মিথেনের পরিমাণ কমানোর কথা ভাবা দরকার। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত মানুষের জীবন-জীবিকা এবং অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে পরা মানুষরাই সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থাগুলি নেওয়া হচ্ছে তা যেন মানুষের জীবন জীবিকার ক্ষেত্রে কোথাও গিয়ে বাধা না সৃষ্টি করে এটা আমাদের দেখা অত্যন্ত জরুরী।

sobujprithibi.in ব্লগ থেকে লেখকের অনুমতি নিয়ে লেখাটি ছাপানো হয়েছে।

Exit mobile version