ভূমিকম্প গবেষকরা কেন বলেন ঢাকা ও সিলেট শহরের অনেক বাড়ি-ঘর প্রচণ্ড ভূমিকম্প ঝুঁকিতে আছে?

কেউ প্রশ্ন করতে পারেন ভূমিকম্পের সাম্ভব্য উৎপত্তিস্হল গুলো থেকে ঢাকা ও সিলেট শহর অনেক দূরে অবস্হিত তাহলে ভূমিকম্প গবেষকরা কেন বলে থাকেন যে ঢাকা ও সিলেট শহরের অনেক বাড়ি-ঘর প্রচণ্ড ভূমিকম্প ঝুঁকিতে আছে?

১৯৮৫ সালে মেক্সিকো শহর থেকে ৪০০ কিলোমিটার দূরে একটা ভূমিকম্প হয়েছিল কিন্তু মেক্সিকো শহরের অনেক বিল্ডিং উল্টে পড়ে। নিচের ছবি ২ টা দেখুন।

ছবি ১: ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ও মেক্সিকো শহর এর অবস্থান

ছবি ২: ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল থেকে ৪০০ কিলোমিটার দূরে মেক্সিকো শহরে বিল্ডিং উল্টে পড়া



ছবি ৩: ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল থেকে ৪০০ কিলোমিটার দূরে মেক্সিকো শহরে বিল্ডিং উল্টে পড়া

আপনি প্রশ্ন করতে পারেন কেন মেক্সিকো শহর এর বিল্ডিং গুলো ভেঙ্গে না পড়ে ঐ ভাবে উল্টে পড়ে গেল। উত্তরটা হবে: মেক্সিকো শহর যেস্হানে গড়ে উঠেছে ঐস্হানটি কোন এক সময় লেক ছিল। লেকটি শুকিয়ে গেলে ঐ ভূমির উপর শহরটি গড়ে উঠে। ঠিক যেমনটি হচ্ছে আমাদের ঢাকা শহরে। ভূতাত্ত্বিক ভাবে বাংলাদেশের ভূমি গড়ে উঠেছে গঙ্গা ও ব্রক্ষমপুত্র নদ বাহিত পলি মাটি দিয়ে। ফলে ভূপৃষ্ঠ থেকে অনেক গভীর পর্যন্ত পলিমাটি বিস্তৃত ও গঠন অনেক নরম। এই মাটির নিচ দিয়ে তরঙ্গ প্রবাহিত হলে ভূমি অনেক বেশি উচ্চতায় কম্পিত হবে ও বিল্ডিং এর নিচের ফাউন্ডেশনের মাটি নরম হয়ে পড়বে যেহেতু মাটি পানি দ্বারা প্রায় সংপৃক্ত থাকে (এই প্রক্রিয়াকে Liquefaction বলে)।

“When liquefaction occurs, the strength of the soil decreases and, the ability of a soil deposit to support foundations for buildings and bridges is reduced as seen in the photo (SC) of the overturned apartment complex buildings”

ঠিক এই কারণে মেক্সিকো শহর এর অনেক বহুতল বিল্ডিং ভেঙ্গে না পড়ে ঐ ভাবে উল্টে পড়ে গিয়েছিল। ভূমিকম্প নিয়ে একাডেমিক পড়া-লেখায় Liquefaction নিয়ে আলোচনা করা হলে সব সময় মেক্সিকো শহর এর কেস আলোচনা করা হয়ে থাকে।


ভূমিকম্প যে স্থানে হয় সেই স্থান থেকে অনেক দূরে কোন স্থানের বাড়ি-ঘড় এর ক্ষতি করে কেন?
=========================================

উপরে বলেছি ভূমিকম্পের ফলে ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলে ফল্ট প্লেনে জমা হওয়া স্থিতি শক্তি seismic waves এর মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। seismic waves প্রধানত ২ প্রকার। ১) Primary waves (p wave) ও ২) Secondary waves (s wave)। এই দুইটি তরঙ্গ যখন ভূ-পৃষ্ঠে পৌঁছে তখন Love waves and Rayleigh waves নামে নতুন ২ প্রকার তরঙ্গের সৃষ্টি করে যাদেরকে বলে Surface waves। তরঙ্গের নাম ভালবাসা হলেও কাজটা কিন্তু করে ঘৃণার। এই দুইটি তরঙ্গ সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে থাকে।

আপনি যদি প্রশ্ন করেন ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্ঠ প্রধান ২ টি তরঙ্গকে কেন Primary waves ও Secondary waves নাম করন করা হয়েছে?

আমরা জানি ভূমিকম্প যে যন্ত্র দিয়ে মাপা হয় তার নাম সিসমোমিটার। নাম তবে নিচের সিসমোগ্রাম দেখুন। কোন স্থানে ভূমিকম্প হওয়ার পড়ে সিসমোমিটারে সর্বপ্রথম যে seismic waves টি পৌছায় তার নাম দেওয়া হয়েছে Primary waves ও এর পরে যে তরঙ্গ পৌছায় তার নাম দেওয়া হয়েছে Secondary waves। সব শেষে পৌছায় Love waves and Rayleigh waves।

ছবি: সিসমোগ্রাম

ভূমিকম্পের উৎপত্তি স্হল থেকে তরঙ্গ কিভাবে seismometer এর পৌছায়?

নিচের ছবিটি দেখুন।




নিচের ছবিটি দেখুন কিভাবে ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল থেকে তরঙ্গ প্রবাহিত হচ্ছে।

ছবি ৪: ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল থেকে seismic waves ছড়িয়ে পড়া

এবারে নিচের ছবিতে দেখুন কোন তরঙ্গ কি প্রকারের ক্ষতি করে থাকে



ছবি ৫: Primary waves যেভাবে বিল্ডিংকে লইরা-চইরা দেয়



ছবি ৫: Secondary waves যেভাবে বিল্ডিংকে লড়াইয়া-চড়াইয়া দেয়

ছবি ৫: ৪ প্রকার তরঙ্গ যেভাবে বৈদ্যুতিক লাইন লড়াইয়া-চড়াইয়া দেয়

ছবি ৬: ৪ প্রকার তরঙ্গ আপনার বিল্ডিঙের নিচ দিয়া গেলে বিল্ডিং এর ইট গুলারে যেমন কইয়া লড়াইয়া-চড়াইয়া দিয়া যাইবো।

বিভিন্ন প্রকারের ভূমিকম্প তরঙ্গ ভূপৃষ্ঠের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হলে মাটি কণা গুলো কিভাবে নড়া-চড়া করে তার খুব সুন্দর একটা এনিমেশন নিচের লিংক থেকে দেখে নিতে পারেন। তাহলে উপরে বর্ণিত বিষয় গুলো আরও সুন্দর ভাবে বুঝতে পারেন বলে মনে করি।

Seismic Wave Theory

=====================================
আপনি যদি জিজ্ঞাসা করেন আমাদের কি করনীয় আছে?
=====================================

নিচের ছবিটি লক্ষ করুন: ভারত সরকার দিল্লীর ঠিক উপরে ১০ কিলোমিটার পর-পর ৫০ টি জিপিএস স্টেশন বসিয়ে প্লেটের মুভমেন্ট পর্যবেক্ষণ করা শুরু করে দিয়েছে দিল্লী শহরের ঝুঁকি নিরূপণ করার জন্য।



একই ভাবে বাংলাদেশ সরকারকে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর ভূতত্ব ও সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ গুলোকে দিয়ে শুধু ঢাকা ও সিলেটের ভূমিকম্প ঝুঁকি যাচাই করার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ডাউকি ফল্টের উপর নিজস্ব জিপিএস স্টেশন বসিয়ে প্লেটের মুভমেন্ট পর্যবেক্ষণ করার উদ্যোগ নিতে হবে।

ডাউকি ফল্ট টি যেহেতু দুই দেশের বাউন্ডারিতে পড়েছে তাই বাংলাদেশ ও ভারত সরকারকে যৌথ ভাবে গবেষণার উদ্যোগ নিতে হবে এই ফল্ট এর সঠিক মুভমেন্ট বুঝার জন্য। অল্প সংখ্যক প্রকাশিত বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধের উপস্থিতি প্রমাণ করে ভারত সরকার ও এই এলাকায় ভূমিকম্প গবেষণায় ততটা মনোযোগ দেয় নি কারণ এই এলাকায় বড় কোন শহর নেই যেখানে কয়েক লাখ মানুষ বাস করে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে কারণ সিলেট শহরটি ডাউকি ফল্ট থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত বিভাগীয় শহর।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে যদি ভূমিকম্প নিয়ে গবেষণা করার যোগ্য গবেষক এর অভাব থাকে তবে প্রবাসী বাংলাদেশী গবেষকদের গবেষণার অর্থ দিয়ে ডাউকি ফল্টের উপর গবেষণা করাতে হবে।

প্রবাসী বাংলাদেশী গবেষক পাওয়া না গলে বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকম্প নিয়ে গবেষণা করা অধ্যাপককে গবেষণার অর্থ যুগিয়ে এই এলাকার উপর গবেষণা করানো যেতে পারে; যেটা একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃত পদ্ধতি।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এর পুরকৌশল বিভাগ এর সাবেক অধ্যাপক ও ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইইবি) এর সভাপতি ড. এম শামীম জেড বসুনিয়া স্যার খুবই সুন্দর একটা প্রবন্ধ লিখেছেন দৈনিক কালের কণ্ঠ পত্রিকায় গত ৪ই মে, ২০১৫ সালে। যেখানে স্যার মন্তব্য করেছে:

“রানা প্লাজা ধসের প্রধান তিনটি কারণ হলো- ক) অত্যন্ত নিম্নমানের কংক্রিটের ব্যবহার, খ) ছয়তলার অনুমোদন নিয়ে ৯ তলা নির্মাণ এবং গ) বাণিজ্যিক হিসেবে নির্মিত ভবনে গার্মেন্ট ভাড়া দেওয়া। রানা প্লাজার ক্ষেত্রে বিষয়টি আমাদের চোখে ধরা পড়েছে বলে আমরা এখন এসব বিষয় নিয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছি। অথচ আতঙ্কের বিষয় হলো- সাভার, আশুলিয়া, টঙ্গী, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ ঢাকার অভ্যন্তরেও এমন শত সহস্র ভবন আছে, সেখানে অত্যন্ত নিম্নমানের কংক্রিট ব্যবহৃত হয়েছে, অনুমোদনের বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত বেশ কয়েক তলা বানানো হয়েছে এবং আবাসিক বা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের জন্য ডিজাইন করা ভবনে কলকারখানা ও ভারী যন্ত্রপাতি বসানো হয়েছে। কাজেই অদূর ভবিষ্যতে যদি আরো কিছু ভবনের রানা প্লাজার মতো পরিণতি হয়, তাহলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। আশঙ্কাজনক হলেও সত্য, কিছু কিছু ক্ষেত্রে রানা প্লাজা থেকেও ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে এবং সে ক্ষেত্রে প্রাণহানির সংখ্যা রানা প্লাজাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।”

ভূমিকম্পে আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন মানসম্মত ভবন নির্মাণ

============================================
আপনি এবার বলতে পারেন এই কাজ তো করবে সরকার আমরা কি করতে পারি?
============================================

সাংবাদিক ফারুক ওয়াসিফের কলামে বর্ণিত একটা গল্প আপনাদের সাথে শেয়ার করার লোভ সামলাইতে পারলাম না। গল্পটা নিম্নরূপ:

“এক নৌকায় মাঝি আর যাত্রী মিলে দুজন যাচ্ছেন। হঠাৎ যাত্রী চিৎকার করে উঠলেন, ‘নৌকায় তো ফুটা, ডুবতেছে ডুবতেছে!’ সেটা শুনে নৌকার মালিক ওই মাঝি ধমকে উঠলেন, ‘নৌকা ডুবলে আমার ডুবতেছে, আপনার কী? আপনি বয়া থাকেন চুপচাপ।’ এ রকম অবস্থায় চুপচাপ বসে থাকা কঠিন। কারণ, নৌকার মালিক ডুবতে রাজি থাকতে পারেন, কিন্তু নৌকার আরোহী হিসেবে ডুবব তো আমরা সবাই!”

এবার আশা করি আপনার করনীয়টা বুঝতে অসুবিধা হবে না। তার পরও মনে করিয়ে দেই:

## আপনি যদি রাজধানী উন্নয়ন কর্পোরেশন বা রাজউক এর ইঞ্জিনিয়ার হয়ে থাকেন তবে অনুরোধ করবো ঘুষ খয়ে যে স্থানে সর্বোচ্চ ৫ তলা বিল্ডিং বানানো সম্ভব সেই স্থানে ৭ তলা বিল্ডিং এর ডিজাইন পাস করবেন না

## আপনি বা আপনার পরিচিত কেউ যদি জমির মালিক হয়ে থাকেন তবে ৫ তলা বিল্ডিং এর ডিজাইন পাস করিয়ে ৭ তলা বিল্ডিং বানাবেন না।

## আপনি যদি ফ্লাট ক্রয় করতে ইচ্ছুক হন তবে দেখে-শুনে তার পর ক্রয় করুন।

## আপনি যদি সন্তান হয়ে থাকেন তবে আপনার পিতা-মাতাকে ঢাকা শহরের ভূমিকম্প ঝুঁকির কথা বুঝিয়ে বলুন।
************************************************************
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ Brian Tucker ভূমিকম্পের ফলে ক্ষতি কমিয়ে আনার জন্য খুব সুন্দর একটা পরামর্শ দিয়েছেন আমেরিকার জিওফিজিক্যাল ইউনিয়ন এর গবেষণা জার্নাল Eos এ।

“A community will reduce its risk of earthquakes when a trusted peer shows that the community’s risk is unacceptably large and demonstrates an affordable, socially acceptable, and verifiable method to reduce that risk,” Tucker says. “School earthquake safety is the entry drug to earthquake risk reduction. Strengthening schools is politically popular,” he adds.

অর্থাৎ, স্কুল পর্যায় থেকেই শুরু করতে হবে ভূমিকম্প নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি। আজকের শিশুই আগামী দিনের বাড়ি নির্মাতা, ক্রেতা, বাড়িওয়ালা, ভাড়াটে, রাজনীতিবিদ ও ইঞ্জিনিয়ার। সুতরাং এদের এখন থেকেই সচেতন করতে হবে।

Reducing Earthquake Risk in Nepal

***********************************************************

এই পোষ্ট দুইটি কেন লিখলাম?

একজন বিশ্ববিখ্যাত ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ এর কয়েকটা লাইন তুলে দিলাম:

“There has been woefully little awareness of earthquake hazard among the peoples and governments of the Himalaya region, and correspondingly little action taken to mitigate the corresponding risk to lives and property.

The blame for this falls as much on the seismologist
as on the politician. Those who have best understood
the potential threat from earthquakes in the world’s highly active seismic zones have done little to communicate their understanding to the growing numbers of people who live in those zones.”

গত শতাব্দীর সেরা বিজ্ঞানী Albert Einstein এর একটা উক্তিও আমাকে এই লেখাটা লিখবার জন্য অনুপ্রাণিত করেছে “Those who have the privilege to know have the duty to act.”



=====================
পরিশিষ্ট:
=====================
এই লেখায় কেউ তথ্যগত কোন ভুল পেয়ে থাকলে তা জানালে কৃতজ্ঞ থাকবো।

ভূমিকম্প বিষয়ে গবেষণা ও নির্দেশনা মূলক কোন পোষ্ট থাকলে মন্তব্য আকারে শেয়ার করুন সকলে উপকৃত হবো।

মূল লেখাঃ https://www.facebook.com/mostofa.k.palash/posts/10222860841122543?notif_id=1619584647019587&notif_t=comment_mention&ref=notif

ফেসবুক আইডিঃ https://www.facebook.com/mostofa.k.palash মোস্তফা কামাল (পলাশ)পিএইচডি গবেষক.স্কুল অফ এনভাইরোমেন্ট এন্ড সাস্টেনিবিলিটি ,সাসকাচোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়, সাসকাটুন, কানাডা

Email: kamaluw@gmail.com

Exit mobile version